এই হতাশার নাম শেখ হাসিনা

এই হতাশার নাম শেখ হাসিনা

ফজলুল বারী: মঙ্গল শোভাযাত্রার ওপর পড়েছে অমঙ্গলের ছায়া! বাংলাদেশের অনেক অগ্রগতির একটি সাংস্কৃতিক বিকাশের মঙ্গল শোভাযাত্রার বিপুল বৈভব।বঙ্গেয় দেশটির সর্বজনীন উৎসব বাঙলা নববর্ষ পহেলা বৈশাখ উদযাপন। গ্রাম থেকে এ উৎসব এসেছে শহরে। মোঘল আমল থেকে ফসল-খাজনা এসব ইস্যুতে বাঙলা নববর্ষ উৎযাপন শুরু হয়। মোঘল সম্রাটরা মুসলমান ছিলেন। তাই বৈশাখ উৎসবের সৃষ্টি হিন্দুদের হাতে এমন বাকোয়াজির ঐতিহাসিক অস্তিত্ব নেই। মোঘলদের পরে গঞ্জের ব্যবসায়ীরা এরসঙ্গে হালখাতাকে মিলিয়ে চিহ্নিত করেন এটির বানিজ্যিক গুরুত্ব। সেই সময়ে এ অঞ্চলের অনেক কিছুর মতো যেহেতু ব্যবসায়ীদের বেশিরভাগ ছিলেন হিন্দু সে কারনে ইতিহাস না জানা লোকজন এরসঙ্গে হিন্দুয়ানির গন্ধ খোঁজেন!কিন্তু এখনতো গ্রাম জনপদের ব্যবসায়ীদের বেশিরভাগ মুসলিম। আদিকালের মতো তারা এখনও দোকানের সঙ্গে কলাগাছের গেট সাজিয়ে পহেলা বৈশাখে হালখাতার উৎসবে খদ্দেরদের মিষ্টিমুখ করান। এরমাধ্যমে তারা আদায়ের চেষ্টা করেন পুরনো বছরের বাকির টাকা। যা এ বছর এনবিআরও করেছে।

পাকিস্তানি আইয়ুবশাহী ওই সময় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিষিদ্ধ করেছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে। এর প্রতিবাদে তখন ছায়ানটের উদ্যোগে বর্ষবরন অনুষ্ঠান শুরু হয় রমনার বটমূলে। সেখানে গাওয়া হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান।নজরুল, দিজেন্দ্রলাল, অতুল প্রসাদের গান। এভাবে দিনে দিনে বাড়ে ছায়ানটের বর্ষবরনের বিপুল বিস্তার। স্বৈরাচারী এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে চারুকলার ছাত্ররা যশোরের মঙ্গল শোভাযাত্রার ধারনাকে নিয়ে আসেন ঢাকায়। বৈশাখী মিছিলে এরশাদের মুখকে গাধার আদল দিয়ে প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন ‘দূর হ’ স্বৈরাচার। বাংলাদেশ তোমাকে চায় না’। সেই থেকে ফী বছর মঙ্গল শোভাযাত্রা দিনে দিনে এতোটাই আড়ম্বরপূর্ন হয়ে উঠেছে যে এটি হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের বৈশাখ উৎসবের অনিবার্য অনুসঙ্গ। যুদ্ধাপরাধের বিচার থেকে শুরু করে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে গণঘৃণা যখন যে আওয়াজ সময়ের দাবি তখন সেটি হয় মঙ্গল শোভাযাত্রার উপজীব্য বিষয়। মঙ্গল শোভাযাত্রা যেহেতু এমন ফী বছর সময়কে ধারন করে সেহেতু এটির গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে দিনে দিনে। বেড়েছে এর গণ সম্পৃক্তি। সময়ের প্রয়োজনে সৃষ্টিশীল গতিময় বর্ণাঢ্য মঙ্গলশোভাকে ঐতিহ্যের স্বীকৃতি দিয়েছে ইউনেস্কো। এরপরই এরওপর আঘাত হানলো মৌল্যবাদ!

এবং এর বিরুদ্ধে হঠাৎ সোচ্চার পক্ষটির অন্তর্নিহীত কারনও খোলাসা হয়েছে ইতোমধ্যে! সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয় এবার সারাদেশে মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজনের উদ্যোগ নেয়। সরকারের যে কোন মন্ত্রণালয়ের যে কোন উদ্যোগ মানে একটি নির্দেশ। সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয়ের নির্দেশটি গেছে সব জেলা প্রশাসকের কাছে। সেখান থেকে উপজেলায়, সব স্কুল-কলেজ মাদ্রাসায়। বাংলাদেশের মাদ্রাসা বেশিরভাগ মানে মূলধারা বিচ্ছিন্ন ভিন্ন এক জগত! দেশের সব স্কুলে প্রতিদিন এসেম্বলি, জাতীয় পতাকা তোলা, জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া হয়। মাদ্রাসায় জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া হয়না! পাকিস্তান আমলে পাক সার জমিন সাদ বাদ গাওয়া হতো! বাংলাদেশ আমলে আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালো্বাসি’’ গাওয়া হয়না! বাংলাদেশের মাদ্রাসা শিক্ষার সিনিয়রদের অনেকে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের পক্ষে ছিলেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে গেলে তারা পরিস্থিতি মেনে নিতে বাধ্য হন। কিন্তু আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতটাকে মানতে পারেননি। তাদের অনেকের মনের মধ্যে এটি একজন হিন্দু কবির লেখা গান! বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো ভোটের বাজারের প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হতে স্কুল কলেজের চাইতে মসজিদ-মক্তব-মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠায় মনোযোগী বেশি। হিসাব নিলে দেখা যাবে এই প্রতিযোগিতায় আওয়ামী লীগ চ্যাম্পিয়ন।

কিন্তু বেশিরভাগ মাদ্রাসায় যে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া হয়না সেটি চোখ বুঝে মেনে নিয়ে চলছে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেয়া সংগঠন আওয়ামী লীগ! দেশের মূলধারা বিচ্ছিন্ন বেশিরভাগ মাদ্রাসায় একুশে ফেব্রুয়ারির শ্রদ্ধাঞ্জলীও হয়না। সেই মাদ্রাসাগুলোতে যখন মঙ্গল শোভাযাত্রার সার্কুলার গেছে তখন ঘটেছে ঘৃতাহুতির ঘটনা! তারা বলেছে এসব কুফরি। তারা এসব কুফরি মানতে নারাজ। গণতন্ত্র কুফরি, নারী নেতৃত্ব কুফরি তাহলে কী মাদ্রাসাবাসীরা বাংলাদেশে থাকেননা? বাংলাদেশ যে ঘুষ দুর্নীতির স্বর্গ রাজ্য কোনদিন কোন ধর্মীয় নেতাকে এর বিরুদ্ধে সোচ্চার দেখা গেছে কী? লক্ষ্য করলে দেখা যাবে খুব অল্প সংখ্যক মানুষ এবার মঙ্গল শোভাযাত্রার বিরুদ্ধে বলতে শুরু করে। এরপর বাংলাদেশে ধর্ম নিরপেক্ষ রাজনীতির মূলধারা আওয়ামী লীগ ঘোষনা দেয় গণভোগান্তি এড়াতে তারা এবার মঙ্গল শোভাযাত্রা তথা পহেলা বৈশাখের আনন্দ শোভাযাত্রা করবেনা! বিএনপি এ ব্যাপারে আনুষ্ঠানিক কোন ঘোষনা না দিলেও তারাও এ ব্যাপারে চুপচাপ আওয়ামী লীগের সিদ্ধান্তকে অনুসরন করেছে। আর জাতীয় পার্টিতো কোন রাজনৈতিক দলই নয়। এরা চলে হাওয়া বোঝে। জনভোগান্তি কথা বলে আওয়ামী লীগ যে মঙ্গল শোভাযাত্রা করলোনা জনভোগান্তির অন্য কারনগুলো তারা মেনে চলবে কী?
সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে সভা করলেও জনভোগান্তি হয়। কারন এই সভাকে কেন্দ্র করে রাস্তার স্বাভাবিক যান চলাচল বিঘ্নিত করে মিছিল আসে যায়। প্রধানমন্ত্রীর চলাচল উপলক্ষে ঢাকায় সহ দেশের নানা জায়গায় রাস্তা বন্ধ করা হয়। একবার রাস্তা বন্ধ করলে যে যানঝটের সৃষ্টি হয় এর রেশ চলে সারা দিন সারা রাত। এসবে কী তাদের বিবেচনায় জনভোগান্তি হয়? পৃথিবীর সভ্য দেশগুলোর প্রায় সবকটিতে রাস্তা বন্ধ করে সভা মিছিল হয়না। সভা হয় মিলনায়তনের ভিতরে। আবার সেই সব দেশেও যার যার দেশের বড় উৎসবের প্যারেড উপলক্ষে বন্ধ রাখায় বিশেষ কিছু রাস্তা। বাংলাদেশের প্রধান উৎসব পহেলা বৈশাখের প্যারেড তথা মঙ্গল শোভাযাত্রার সময় কপট রাজনীতিকদের মনে পড়লো জনভোগান্তির কথা? যারা কাজের দিনে রাস্তা বন্ধ করে সভা মিছিল করে মানুষকে কষ্ট দেয় তারা ছুটির দিনে দেশের একটি গোষ্ঠীকে খুশি করতে ছুটির দিনে মঙ্গল শোভাযাত্রা করলোনা! কিন্তু তাতে কী তাদের কোন লাভ হয়েছে? বৈশাখের দ্বিতীয় দিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন তাদের কাছে খবর ছিল মঙ্গল শোভাযাত্রায় হামলা হতে পারে। এসব হুমকি জবাবতো সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মাধ্যমে দিতে হয় তা প্রধানমন্ত্রীর চেয়ে কে বেশি জানেন বিষয়। আর হুমকিতে ভয় পেয়ে আওয়ামী লীগকে নিরাপদ রাখতে ঘরে ঢুকিয়ে রাখলেন আর রাস্তায় যারা ছিলেন তারা ঝুঁকির মধ্যেই ছিলেন এ কেমন কথা?

আওয়ামী লীগ মঙ্গল শোভাযাত্রা না করলেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মঙ্গল শোভাযাত্রার ইতিহাস উল্লেখ করে বলেছেন ইতিহাস নিয়ে যাতে কেউ বিভ্রান্তি না ছড়ায়। প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, বর্ষবরণের অনুষ্ঠান নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। এ ব্যাপারে দেশবাসীকে সর্তক থাকার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা বাঙালির সংস্কৃতিরই অংশ। ধর্মের সঙ্গে এর কোনও সম্পর্ক নেই। এখানে ধর্মকে টেনে আনার কোনও যৌক্তিকতা নেই। এটাকে নিয়ে অনেকে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছেন। এ বিষয়ে দেশবাসীকে সতর্ক থাকতে হবে।’ কিন্তু সম্মিলিত উলামা মাশায়েখ পরিষদের ব্যানারে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখানো হয়েছে। এরা বলেছে, “মঙ্গল শোভাযাত্রা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী যে বক্তব্য দিয়েছেন তা ইসলাম, ইসলামী মূল্যবোধ ও সভ্যতা-সংস্কৃতির সাথে সম্পূর্ণরূপে সাংঘর্ষিক। কোন মুসলমানই বিন্দুমাত্র ঈমান থাকতে মঙ্গল শোভাযাত্রা করতে পারে না। একজন ঈমানদার তা কখনও মেনে নিতে পারে না বা অন্য কাউকে উদ্ধুদ্ধ ও উৎসাহিত করতে পারেনা।

ইহা মূলত বিজাতীয় সংস্কৃতির অংশ,যা ইসলাম বিদ্বেষী মহল, বে-দ্বীন, মুসলিম নামধারী মুরতাদ ও ইবলিসের প্ররোচনা। বিবৃতি সম্মিলিত উলামা মাশায়েখ পরিষদের পক্ষ থেকে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়, কুরআনের আলোচ্য নির্দেশনার আলোকে মঙ্গল শোভাযাত্রা ও পশুআকৃতিরূপী সাজা চিরতরে হারাম ঘোষিত হয়েছে। মাদরাসাসহ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এ মঙ্গল শোভাযাত্রা পালনের জন্য সরকারী সার্কুলার জারি করে সরকার কাদেরকে খুশী করতে চান তা বোধগোম্য নয়? ৯৫ ভাগ মুসলমানের এদেশে এহেন গর্হিত হারাম কাজ গোটা জাতির উপর চাপিয়ে দেয়ার দুঃসাহস সরকার দেখাবে না বলে শীর্ষ উলামায়ে কেরাম মনে করেন।”

মঙ্গল শোভাযাত্রা বিরোধী শক্তির সঙ্গে আপোসের পরও এই সম্মিলিত উলামা মাশায়েখ পরিষদের বক্তব্যের পর আওয়ামী লীগের আত্মতুষ্টি কী? ভোট কী বাড়লো? না আরও ঝুঁকির মধ্যে পড়লো? আজকাল প্রায় আমরা দেখি প্রধানমন্ত্রীর অফিসে উলামা মাশায়েখদের সভা, খাওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী তাদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন। এই উলামা মাশায়েখরা কারা? শাপলা চত্ত্বরে আগুনের সঙ্গে জড়িত মামলার আসামী তেঁতুল হুজুররা যে গণভবন ঘুরে গেলেন তাদের সঙ্গের কয়জন উলামা মাশায়েক এই বিবৃতির সঙ্গে জড়িত? আওয়ামী লীগ নিজেদের চরিত্র হারিয়ে যাদের তোষামোদি করেছে তারা কী কোনদিন নৌকায় ভোট দিয়েছে? না কোনদিন দেবে? বাঙালির বাংলাদেশ কিভাবে চলবে না চলবে এসবতো মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে চূড়ান্ত হয়েছে। ভিন্নপথতো বিএনপির। আওয়ামী লীগ কী নিজেদের পথ ছেড়ে মুক্তিযুদ্ধে তৈরি পথ ছেড়ে বিএনপির পথে হাঁটার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত? তাহলে মানুষের কাছে আওয়ামী লীগ বিএনপির পার্থক্য কী?

গণতন্ত্রে যাদের চাল-চুলো নেই, ভোটে দাঁড়ালে জামানত বাজেয়াপ্তে চ্যাম্পিয়ন হবে এমন কয়েকজন মোল্লা-মৌলভীর বক্তব্যে থরথর কম্পমান যদি হয় আওয়ামী লীগ এ দল কী করে বাংলাদেশকে মাঝারী আয়ের দেশ, উন্নত দেশের পথে নিয়ে যাবে? এরা এখন গ্রীক দেবীর ভাষ্কর্য অপসারন বিজয়ী। বঙ্গবন্ধুর সব ভাষ্কর্য ভাঙ্গার দাবি যখন তুলবে, মঙ্গল শোভাযাত্রার সুতিকাগার চারুকলা বন্ধের দাবি যখন করবে তখন কী করবেন? আর যখন বলে বসবে নেকাব পরতে হবে আপনাকেও! হঠাৎ করে চারুকলার হিন্দু শিক্ষার্থীদের গরুর মাংসের তেহারি খাইয়ে দিয়ে উত্তেজনা সৃষ্টির বিষয়টিকে কী বিচ্ছিন্ন ঘটনা মনে হয়? যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে সাহসী শেখ হাসিনার প্রতিক্রিয়াশীলদের প্রতি এমন নতজানু ভূমিকায় আওয়ামী লীগের ভিতরের লোকজন বাইরের লোকজনের মধ্যে হতাশা ছড়াচ্ছে। আশার নাম যদি শেখ হাসিনা হয় এক্ষেত্রে হতাশার নামটিও শেখ হাসিনা। আপোসের এই পথটি আলোর পথ নয়। শেখ হাসিনার পথ নয়। অতএব শেখ হাসিনা হুশিয়ার।

Comments

comments


Related Articles

Foreign Minister’s visit to New Delhi: What did Bangladesh get?

The third meeting of the India-Bangladesh Joint Consultative Commission (JCC) was held in New Delhi on September 20, 2014. The

Dhaka’s Traffic Problem – Opportunities and Suggested Solutions

Abstract Dhaka, the capital city of Bangladesh is one of the most populated and polluted cities in the world. It

Successful Delivery of Bangladesh eGovernment Strategy by Australian National University

Several events in Dhaka, Bangladesh marked the delivery of major project outputs to develop e-government capacity in Bangladesh government being

No comments

Write a comment
No Comments Yet! You can be first to comment this post!

Write a Comment

Your e-mail address will not be published.
Required fields are marked*