Print this page

এক মাত্র বিদেশি বীর প্রতীকঃ বাঙালির গৌরব - সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল

কে এই ওডারল্যান্ড?

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সাথে যাঁরা সম্পৃক্ত হয়ে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ইতিহাসকে করেছেন গৌরবান্বিত ও মহিমান্বিত, ওডারল্যান্ড তাঁদেরই অন্যতম। তিনি তাঁর সাহসী ভূমিকা ও সুমহান অবদান রেখে বাংলাদেশের মানুষের হৃদয় জয় করেছেন। তাই ওডারল্যান্ড একজন গর্বিত বীর মুক্তিযোদ্ধা, একটি গর্বিত নাম।
মহান মুক্তিযুদ্ধের পর গণযোদ্ধা তালিকায় ৭৮ নম্বর মুক্তিযোদ্ধার নামটি দেখে খটকা লাগলো- ডব্লিউ. এ. এস. ওডারল্যান্ড! কারণ কোনো বাঙালির নাম সাধারণত এ রকম হয় না। তারপর ১৫ ডিসেম্বর -৭২ তারিখে সরকারি গেজেট (৮/২৫/ডি-১/৭২)-এর তালিকায় ১৩৮৭ নম্বর বীরপ্রতীক হিসেবে যার নাম অন্তর্ভুক্ত তিনিও একই ব্যক্তি- ওডারল্যান্ড! পরে আনোয়ার ফরিদী সম্পাদিত ‘অতন্দ্র একাত্তর’ সংকলনে তাঁর সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যায়।

১৯১৭ সালের ৬ ডিসেম্বর নেদারল্যান্ডে জন্ম গ্রহণকারী ওডারল্যান্ড দ্বিতীয় মহাযুদ্ধেও একজন বীর সেনানী ছিলেন। কাজ করতেন বাটা সু কোম্পানীতে। সেই সূত্রে ১৯৭০ সালে পোষ্টিং পেলেন ঢাকায়। ৭১-এ শুরু হল মুক্তিযুদ্ধ। যার রক্তের ভিতর যুদ্ধের দামামা বাজে, সেই বীর সেনানী ওডারল্যান্ড আবারো বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। কখনো গোয়েন্দাগিরি, কখনো আলোকচিত্রী, কখনো সক্রিয় যুদ্ধে অংশ নিলেন বাঙালিদের সাথে। মুক্তিযোদ্ধাদেরকে বুকে জড়িয়ে নেন নিজের সন্তানের মতো। যুদ্ধ শেষ, দেশ স্বাধীন হলো। তিনি খেতাব পেলেন বীরপ্রতীক। ১৯৭৮ সালে চলে যান স্বদেশে, অস্ট্রেলিয়ায়।

আনোয়ার ফরিদী ব্যক্তিগতভাবে ওডারল্যান্ডকে চিঠি লেখেন ২৪ জানুয়ারি ’৯৭ সালে এবং অসুস্থ অবস্থায় ২২ ফেব্র“য়ারি ১৯৯৭ সালে দীর্ঘ জবাব দেন ওডারল্যান্ড। সেই চিঠির সাথে শুভেচ্ছাস্বরূপ পাঠান বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ জিনিস, ছবি, সার্টিফিকেট ইত্যাদি। এসব দেখে অভিভূত হই। এবং তা বাংলাদেশ টেলিভিশনের ‘দৃষ্টি ও সৃষ্টি’ এবং ‘ইতিহাসের পাতা থেকে’ এই দুটি অনুষ্ঠানে প্রচারিত হয়। বর্তমানে তাঁর প্রদত্ত সেই সব উপহার সামগ্রী ঢাকা জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে।

অন্য প্রকাশ থেকে প্রকাশিত জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরী অনূদিত এবং সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল সম্পাদিত ‘Poems of Liberation War’ গ্রন্থটি উৎসর্গ করা হয়- ডব্লিউ.এ.এস ওডারল্যান্ডকে।

এই মহান মানুষটি ছাড়াও আমাদের মুক্তিযুদ্ধে অনেক বিদেশী কবি, সাংবাদিক, শিল্পী সরাসরি সমর্থন ও সহযোগিতা করেছেন, যেমন : Andre Malraux, Allen Giunsburg, Lear Levin, Geoge Harisson, Eric Clapton, Mick Jagger, Joan Baeg, Bob Dylan, Ravi Shankar, Shelim Ahemed, Sayed Asif Shahker, Tammy Murtior, Ronald J Garst, Father Morino Beagel, Shuoshi Nara, Mariatta Prokope, Elizabeth O’Brian, Lear Lainbary প্রমুখ এবং পশ্চিমবঙ্গের লেখক বুদ্ধিজীবীবৃন্দ।

কিন্তু এদের মধ্যে ওডারল্যান্ডের ভূমিকা এবং অবদান সম্পূর্ণ অন্যরকম। কারণ তিনি সরাসরি যুদ্ধ করেছেন এবং বীরপ্রতীক খেতাব পেয়েছেন। সাংবাদিক ও এনজিওকর্মী সেলিম সামাদ অস্ট্রেলিয়া যাবার সময় ওডারল্যান্ডকে উৎসর্গকৃত ‘Poems of Liberation War’ বইটি নিয়ে যান এবং অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী কামরুল আহাসান খানের মাধ্যমে তাঁর কাছে পৌঁছান। সে সময় ওডারল্যান্ড এতোই অসুস্থ যে চিঠি লেখার অবস্থা ছিল না। জানা গেছে বই পেয়ে তিনি ভীষণ খুশি হয়েছিলেন। কারণ, এখনো বাঙালিরা তাকে মনে রেখেছে?

বিটিভিতে এই লেখকের বেশ কটি নাটক প্রচার হয়েছে সব কটি নাটকই গতানুগতিক নাটকের বাইরে। বিটিভি নাটক বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বর্তমানে উপ-পরিচালক মাহবুবুল আলমকে একমাত্র বিদেশী বীরপ্রতীক ওডারল্যান্ডকে নিয়ে একটি নাটক লেখার প্রস্তাব দিলে তিনি নানা ধরনের জটিলতা তুলে ধরলেন (যদিও তিনি সব সময় নাটক লেখার ক্ষেত্রে অত্যন্ত আন্তরিকভাবে সহযোগিতা করেন)। পরে সরাসরি তৎকালীন বিটিভির ডিজি সৈয়দ সালাহউদ্দিন জাকীর কাছে প্রস্তাব দেয়া হলে এবং তা অনুমোদিত হয়। যখন নাটকের মহড়া চলছিল, ঠিক তখনই ১৮ মে ২০০১ সালে ওডারল্যান্ড পরলোকগমন করলেন। সেই সংবাদটি পেলাম সাংবাদিক ও অভিনেতা শামীম শাহেদের কাছ থেকে। শোক সংবাদে হয়ে উঠলাম কিংকর্তব্যবিমুঢ়।

তাঁর মৃত্যুতে নাটকটির গুরুত্ব পায় এবং সবার দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়। যদিও বেশকিছু বিষয় নাটকে প্রচার করা সম্ভব হয়নি। যেমন- ওডারল্যান্ড বাটা সু কোম্পানিতে কাজ করতেন। কর্তৃপক্ষ বাটার কথা প্রচারে আপত্তি তুলে। তাতে নাকি বাটা জুতোর প্রচার হয়ে যাবে। তারপর স্বাধীনতা বিরোধীদেরকে রাজাকার বলা যাবে না। এই হচ্ছে বিটিভির অলিখিত সমস্যা ও সীমাবদ্ধতা।

নাট্যশিল্পীদের চরম ব্যস্ততার কারণে প্রায় মহড়া ছাড়াই নাটক ধারণ শুরু হলো। ‘ওডারল্যান্ড’ চরিত্রে একদিন মহড়ার পরদিনই অপারগতা প্রকাশ করলেন মানস বন্দ্যোপাধ্যায়। শেষে হাল ধরলেন খায়রুল আলম সবুজ। ক্যামেরায় ধারণের দ্বিতীয় দিন এলেন না মুক্তিযোদ্ধা কাওসারের চরিত্রে কাওসার চৌধুরী। সেই বজ্রপাত অবস্থায় নতুন শিল্পীর সন্ধানে আমি আর প্রযোজক ফারুক ভূঁইয়া ফোন করি মাহমুদ সাজ্জাদকে। তিনি দুপুরে স্ক্রিপ্ট নিলেন এবং সেদিনই সন্ধ্যায় রেকর্ডিং হলো। কাউসারের চরিত্রে মাহমুদ সাজ্জাদ সত্যিই এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত রাখলেন। দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন খায়রুল আলম সবুজও, তিনি ওডারল্যান্ডের চরিত্রে অনবদ্য অভিনয় করে নাটককে মর্মস্পর্শী করে তোলেন।

২০০১ সালের ২ জুন প্রচারিত এ নাটকে আরো যারা অভিনয় করেন তারা হলেন- শামস সুমন (উৎসব), তাজিন আহমেদ (উপমা), বিশ্বজিৎসরকার (প্রবাসী সাংবাদিক), সুমনা ইসলাম (সোমা) প্রমুখ এবং ছোটদের তালিকায় আমার মেয়ে অনাদি নিমগ্ন। নাটকটির প্রধান বক্তব্য ছিল যে- মুক্তিযোদ্ধা মোহম্মদ আলী, নেলসন মেন্ডেলা, গর্ডন গ্রিনিজ, ব্যালটি এ্যাড টেলর, অমর্ত্য সেন এঁরা বাংলাদেশের সম্মানজনক নাগরিকত্ব পেয়েছেন। এঁদের তালিকায় ওডারল্যান্ডও থাকতে পারতেন।

এছাড়াও বাংলাদেশ সরকার ইচ্ছে করলে তাঁকে স্বাধীনতা পুরস্কার দিতে পারতেন। কিন্তু স্বাধীনতা পুরস্কার দেয়া তো দূরের কথা, স্বাধীনতার রজতজয়ন্তীতেও তাঁকে রাষ্ট্রীয়ভাবে নিমন্ত্রণ করা হয়নি। সিডনির অনেক প্রবাসী বাঙালিই [যেমন নেহাল বারী, এজাজ আল মামুন (দ্রঃ পরিক্রমা মার্চ-এপ্রিল ২০০১ সংখ্যা)] তাঁর নাগরিকত্বের দাবি জানিয়েছেন।

দুঃখজনক হলেও সত্য, বিটিভির সংগ্রহশালা থেকে এই গবেষণাধর্মী দর্শকনন্দিত নাটকের ক্যাসেটটি হারিয়ে গেছে। কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

এই মানবতাবাদী ওডারল্যান্ডের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে এই নাটকটি গ্রন্থাকারে প্রকাশ করেন কলম্বিয়া প্রকাশনীর কর্ণধার বীর মুক্তিযোদ্ধা লে. কর্নেল নূরুন্নবী বীর বিক্রম (বরখাস্ত)। এই মহান বীর মুক্তিযোদ্ধা ওডারল্যান্ডের প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি। কারণ,  দেশ ও জাতি তার কাছে চির কৃতজ্ঞ।