Print this page

গুনুমেলেঙ্গ বা ডারুইনের বৈশাখ - চৌধুরী মোহঃ সদরউদ্দিন

১৯৯৯ সালের এপ্রিল মাষ, তারিখটা চার বলেই মনে হয়। সপরিবারে ডারউন এয়ারপোর্টে এসে পৌছে যে জিনিশটা আমাদের প্রথম ধাক্কা দিলো সেটা হচ্ছে অঝোর ধারার বর্ষা। সিডনির বৃষ্টির সাথে যদি তুলনা করি তবে বলা যায়, আমার বাগানের পানি দেবার পাইপ আর ফায়ার ব্রিগেটের ফায়ার হোস। ইংরেজিতে যেটাকে বলে “বাকেটিং”, ব্যপারটা ডারউইনের ক্ষেত্রে মিলে না। বালতির থেকে আরও বড় কিছু হলে মনে হয় ভালো হত। বাংলার বর্ষার সাথে এর মিল পেলাম অনেক। আজ অবশ্য বর্ষা নিয়ে লিখছিনা। লেখার বিষয়টা বাংলা নববর্ষ।

ভৌগলিক অবস্থানের দিক থেকে দেখলে অস্ট্রেলিয়ার সাথে বাংলাদেশের প্রধান পার্থক্য হচ্ছে বাংলাদেশ উত্তর গোলার্ধে আর অস্ট্রেলিয়া দক্ষিনে। ফলাফলে বছরের যেকোন সময়ে সূর্যের অবস্থান থাকে একদম আলাদা। বা গানিতিক ভাবে বল্লে বলা যায় ১৮০ ডিগ্রী উল্টা। এই ১৮০ ডিগ্রীর হিসেবটা মনে রেখে আর সেই প্রথম দেখা ডারউনের বর্ষার সাথে তুলনা করে ডারউনের ঋতু চক্রের সাথে বাংলার ষড়ঋতুর পেলাম অনেক মিল। তবে অশ্চর্য হলাম যখন জানলাম ডারউনের আদিবাসি অস্ট্রেলিয়ানদের রয়েছে ছয়টা ঋতু। ১৮০ ডিগ্রীর হিসাবটা করে  আমরা যদি পাশাপাশি তুলনা করি তবে মনে হয় ব্যাপারটা হবে আরও বিস্মঃয়ের।

বাংলাদেশের ষড়ঋতু

এবোরেজিনিয়াল ষড়ঋতু

বর্ষা  

Rainy Season (June to August)

Gudjewag

Monsoon Season (Jan – March)

শরত

Autumn (September to October)

Bang – Gerreng

Knock’em down storm season ( March – April)

হেমন্ত

Late Autumn (October to November)

Yegge

Cool but still humid season ( May – June)

শীত

Winter (November to December)

Wurrgeng

Cold Weather Season ( July – August)

বসন্ত

Spring (December to February)

Gurrung

Dry weather season ( Sept – October)

গ্রীষ্ম

Summer ( March to May)

Gunumelenge

Pre-storm season (October – December).

 

১৪ই এপ্রিল, আর কয়দিন পরেই আসছে বাংলা নববর্ষ ১৪১৯। আমরা যারা প্রবাসে বাস করি তারা বিভিন্ন ভাবে পালন করব সেই দিনটাকে। গানে, নাচে, কবিতায় ইত্যাদিতে। তবে সেটার মাঝে যেটার ঘাটতি সব সময় থেকে যাবে সেটা হচ্ছে বৈশাখের সেই আমেজ,

“তাপস নিশ্বাস বায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে,”

তবে মনের মাধুরী আর প্রানের ভলোবাসা সে স্থানটাকে যে একদম পুরন করে দেবে  সে ব্যাপারে আমার নেই সন্দেহ।

১৯৯৯ থেকে ২০১২ এই দীর্ঘ সময় আমার দেখা গুনুমেলেঙ্গ বা ডারুইনের বৈশাখ নিয়ে এই লেখা। গুনুমেলেঙ্গ-এর শুরুটা সাধারনত মধ্য অক্টোবর তবে সেটাযে একদম স্থির তা নয়। প্রতি বছরেই এর আছে পরিবর্তন। এর স্থায়িত্তও কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাসও দেখেছি। শুরুটা হয় বাতাসের আর্দ্রতার বৃদ্ধি দিয়ে। সাথে বিকেলের কালো মেঘ, কবি গুরুর ভাষায়

এমনি করে কাজল কালো মেঘ
জ্যৈষ্ঠমাসে আসে ঈশান কোণে।

এর পর পরি থাকে দমকা বাতাস সাথে কয়েক পশলা বৃষ্টি।মনে করিয়ে দেয়।

“মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জ্বরা,
অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা
রসের আবেশরাশি শুষ্ক করি দাও আসি,
আনো আনো আনো তব প্রলয়ের শাঁখ
মায়ার কুজ্ঝটিজাল যাক দূরে যাক”

তবে আমার কাছে যেটা সবচেয়ে মজা লাগে সেটা হচ্ছে আমের মুকুল।ডারুইনের আমের মৌসুমটাও শুরু হয় এসময়। আমার বাসার থেকে একটু দূরের বিশাল সব আমের বাগান এসময় ভরে যায় আমের মুকলে। গাছে গাছে আমের মুকুল মনে করিয়ে দেয় আবার কবিগুরুর গানকে।

“ও মঞ্জরী, ও মঞ্জরী, আমের মঞ্জরী
আজ হ্রদয় তোমার উদাস হয়ে পারছে কি ঝরি।
আমার গানযে তোমার গন্ধে মিশে দিশে দিশে
ফিরে ফিরে ফেরে গুঞ্জরী”।

সবার সাথে আমদের ডারউনের ছোট্ট বাঙ্গালী সমাজ প্রতি বছর পালন করে বাংলা নববর্ষকে। তবে বৈশাখের যে আলাদা আমেজ সেটা আমরা অনুভব করি গুনুমেলেঙ্গ-এর সাথে সাথে।

ডারউইন, ০১/০৪/২০১২