Print this page

স্মৃতির পাতায় হালখাতা - ফজল হাসান

এক
কথায় আছে, স্মৃতি একধরনের বেদনা, যা মানুষের মনের গোপন গভীরে অযত্নে অথবা সযত্নে জমা থাকে । সেখানে দিনের পর দিন ধূলোর আস্তরণ পড়ে ক্রমশ অনেক স্মৃতিই চিরদিনের জন্য হারিয়ে যায় বিস্মৃতির অতলে । এসব স্মৃতিগুলোকে হাজার চেষ্টা করেও কখনই ফিরিয়ে আনা যায় না । আবার কিছু কিছু স্মৃতি আছে, যা বিশাল আকাশের গায়ে ঝুলে থাকা দূরের ধূসর তারার মতো নীরবে নিঃশব্দে জেগে থাকে । এসব স্মৃতিরা মনের গোচরে কিংবা অগোচরে বারবার ফিরে আসে এবং মনকে আন্দোলিত করে । তখন মানুষকে নষ্টালজিয়ার অদৃশ্য কষ্ট এবং একধরনের বেদনার হাহাকার চারপাশ থেকে জড়িয়ে ধরে । মন চায় ফিরে যেতে সেই অতীতে । কিন্তু চাইলেই যেমন সব কিছু পাওয়া যায় না, তেমনই প্রবল বাসনার ফুলকুঁড়ি ফোটলেও অতীতের মনোরম বাগিচায় গিয়ে সেই গন্ধমাখা স্মৃতির ফুলকুঁড়ি তুলে আনা যায় না । এছাড়া মনের স্নিগ্ধ সরোবরে জিয়ল মাছের মতো আচমকা লাফিয়ে উঠা স্মৃতিগুলো কিছুতেই ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না, কিন্তু চোখের পাতা বন্ধ করে গভীরভাবে উপলব্ধি করা যায় । তখন কেন জানি অবচেতনে বলে ফেলি, ‘স্মৃতির পাতায় ভেসে ওঠো, স্বপ্নে আসো তুমি, জাগরণে বাড়ালে হাত, স্পর্শ করি ভূমি ।’ তখন মন খারাপ হয়, কেবল বেদনা অনন্ত হয় । আর আমরা বেদনার বেনোজলে আকন্ঠ ডুবে থেকে কী অদ্ভুতভাবে বেঁচে থাকি ।
দোকানে ঢুকে আমরা, সাধারনত মহিলারা, যেমন কোন কিছু, বিশেষ করে শাড়ি, কেনার আগে বারবার নেড়ে-চেড়ে উল্টে-পাল্টে দেখি, মনকে প্রবোধ দিই, চোখ দু’টোকে শান্ত-শীতল করি, তেমনই আমার স্মৃতির ধূসর পাতাগুলো থেকে ফুঁ দিয়ে আলতো করে ধূলোর প্রলেপ সরিয়ে উল্টিয়ে-পাল্টিয়ে দেখলাম এবং মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলাম যে পহেলা বৈশাখ কিংবা বাংলা নববর্ষ সম্পর্কে লেখার জন্য  হালখাতা নিয়ে আমার জীবনের ঘটনার কথাই বলবো । তবে তার আগে বাংলা নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ এবং কেমন করে হলখাতার সূচনা হয়েছিল, সে সম্পর্কে কিছু বলার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছি ।

দুই
পহেলা বৈশাখ বাংলা সনের প্রথম দিন । বাংলাদেশের রাজধানীসহ প্রত্যন্ত অঞ্চলে এ দিনটি নববর্ষ হিসেবে ঘটা করে পালন করা হয় । বাংলা নববর্ষ বাংলাদেশের একটি সর্বজনীন এবং ঐতিহ্যবাহী ধারা, যা বাঙালী এবং বাংলাদেশীদের রক্তের হিমোগ্লোবিনে মিশে আছে । পুরনো বছরের সমস্ত গ্লানি, ভুলত্রুটি, ব্যর্থতা আর দুঃখ-দূর্দশাকে ভুলে গিয়ে মানুষ দিনটিকে নতুন বছরের প্রত্যাশা, কল্যাণ এবং সফলতার আকুল আকাঙ্খায় বরণ করে নেয় ।
মোগল সম্রাট আকবরর সময় থেকে মূলত বাংলা নববর্ষ পালনের সূচনা হয় । তারপর থেকে মোগলদের জমিদারী প্রথা বিলুপ্ত হওয়া পর্যন্ত পহেলা বৈশাখ পালন করতো । তখন বাংলার কৃষকরা চৈত্রমাসের শেষদিন পর্যন্ত জমিদার, তালুকদার এবং অন্যান্য ভূ-স্বামীদের খাজনা পরিশোধ করতো । পরদিন পহেলা বৈশাখ, অর্থাৎ নতুন বছরের প্রথম দিনে, ভূ-স্বামীরা তাদের মিষ্টিমুখ করিয়ে পুনরায় সম্পর্ক গড়ে তুলতো । এ দিনে গ্রামে-গঞ্জে-নগরে ব্যবসায়ীরা পুরনো খাতার হিসেব-নিকেশ সম্পন্ন করে হিসেবের আনকোরা খাতা খুলতো । তাই এই অনুষ্ঠানকে বলা হয় হালখাতা । যদিও এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে অর্থনৈতিক ব্যাপার-স্যাপার, তবুও অতীতে বাংলা নববর্ষের অন্যতম উৎসব ছিল এই হালখাতা ।

তিন
আমার জন্ম মুন্সিগঞ্জের মিরকাদিমে । বাবা তখন মিরকাদিম পোষ্ট অফিসের পোষ্টমাস্টার । অফিসের পেছনেই বাসা । মা ছিলেন পুরোপুরি গৃহিণী । সারাদিন সংসার নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন । গত শতাব্দীর ষাট দশকের মাঝামাঝি সময়র কথা । আমি তখন ছোট্ট এক অবুঝ বালক । সবে মাত্র মায়ের স্নেহের আঁচল ছেড়ে প্রাইমারী স্কুলে ঢুকেছি । পড়নে হাফ প্যান্ট, গায়ে হাওয়াই সার্ট আর বগলের নিচে বই এবং শ্লেট । আশেপাশের কয়েকজন মিলে দল বেঁধে হেঁটে যেতাম স্কুলে ।
যাহোক, মিরকাদিমের মাইল খানেক দূরেই ব্যবসা-বাণিজ্যে সুপরিচিত জায়গা কমলাঘাট । ধলেশ্বরী নদীর ধারে অবস্থিত এই কমলাঘাটে অতীতে বিভিন্ন পণ্য সামগ্রীর রমরমা ব্যবসা ছিল । সেই সময় ব্যবসায়ীদের অধিকাংশই ছিল বণিক, অর্থাৎ হিন্দু সম্প্রদায়ের । বাবাকে তারা অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন । মনে পড়ে, অনেক সময় রাতেও তারা সরসরি বাসায় এসে বাবাকে ডেকে নিয়ে অফিস খুলে টেলিগ্রাম করতেন । বলাবাহূল্য, সেই সব এনালগ দিন ডিজিটাল ছিল না, কম্পিউটার ছিল না, ছিল না ইমেইল, ফেইসবুক, টুইটার, মুঠোফোন কিংবা ফ্যাক্স মেশিন । তখন তড়িৎ যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম ছিল টেলিগ্রাম, যা মোহর্স কোডের ভাষায় টরে টক্কার মাধ্যমে সংবাদ পাঠনো হতো । বাসায় থাকলে বাবা কখনই তাদের জরুরী প্রয়োজনকে অবহেলা করতেন না, বরং সঙ্গে সঙ্গে হাসি মুখে তাদের জরুরী কাজ করে দিতেন । কোনদিন বাবা চোখেমুখে কোনধরনের বিতৃষ্ণা কিংবা রাগের চিহ্ন ফুটিয়ে তোলেননি । বোধহয় সে জন্যই তারা বাবাকে বিশেষভাবে সমীহ করতো । সে সব ব্যবসায়ীরা নিজেরা এসে বাবা এবং আমাদের হালখাতা অনুষ্ঠানের মিষ্টি খাওয়ার নিমন্ত্রণ করতেন । 
পহেলা বৈশাখের সকাল থেকেই তখন মনটা আনচান করতো । কেননা বিকেল বেলা বাবা এবং মেজো ভাইয়ের সঙ্গে হালখাতা অনুষ্ঠানে যেতাম । কয়েকটা দোকানে মিষ্টি খাওয়ার পর অন্য আর কোন দোকানে খেতে পারতাম না । তখন ওরা প্যাকেট করে বাসার অন্যান্যদের জন্য দিয়ে দিতো । একবার পহেলা বৈশাখের দিন দেশের বাড়ি থেকে এক চাচাতো ভাই এসেছিলেন । তখন তার বয়স ছিল কুড়ি থেকে বাইশর মধ্যে । যাহোক, সেদিন বাবা তাকে আমাদের সঙ্গে থেকে যেতে বলেছিলেন । যথারাতি বিকেলে আমার মেজো ভাই এবং আমি তৈরী । অফিস থেকে ফিরে এসে বাবা সেই চাচাতো ভাইকেও তৈরী হতে বললেন । এখানে বলে রাখা প্রয়োজন যে, আমার সেই চাচাতো ভাই ছিলেন অবিশ্বাস্য রকমের পেটুক । কোনরকম হুস্ হাস্ না করেই অনায়াসে তিনি দেড় সের চালের ভাত (আনুষঙ্গিক উপাদান, যেমন ভর্তা-ভাজি, মাছ-মাংস এবং ডাল বা এ জাতীয় অন্য খাবার ছাড়া, এমনকি পানি ছাড়া) পেটের ভেতর চালান করে দিতে পারতেন । সাধারনত দুপুরে বাসায় কোন অতিথি এলে মাকে নুতন করে ভাত রান্না করতে হতো না । আমাদের সঙ্গে অতিথির খাওয়া হয়ে যেতো । কিন্তু সেই চাচাতো ভাই এলে মাকে আবার ভাত রান্না করতে হতো ।
যাহোক, আমাদের সঙ্গে চাচাতো ভাই যাবেন শুনে আমরা যারপর নাই খুশিতে আটখানা । বিকেলে যথারীতি তিনি আমাদের সঙ্গে রওনা হলেন । পথিমধ্যে বাবা তাকে উৎসাহের সঙ্গে বললেন যে তিনি যেন যত খুশী মিষ্টি খান । গোটা দশ-বারোটা দোকানে প্রচুর মিষ্টি খেলেন । কয়েকটা দোকানের মালিকদের বাবা আলাদা করে বললেন তাকে যেন বেশী করে মিষ্টি দেওয়া হয় । দোকানীরা কোন কার্পণ্য করেনি, বরং ভীষণ উৎসাহিত হয়ে বেশী করে মিষ্টি পরিবেশন করেছিল । রাতে ফেরার পথে বাবা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কি রে, পেট ভরেছে ?’ চাচাতো ভাই বাবাকে খুব ভয় করতেন । তাই ভয়ে তিনি শুধু অস্ফুট স্বরে বললেন, ‘হ্যাঁ ।’ বাবা বললেন, ‘আগামি বছর এই দিনে চলে আসিস ।’
না, পরের বছর চাচাতো ভাই আসেননি । কেননা বাবা বদলি হওয়ায় আমরা সবাই চলে আসি নারায়ণগঞ্জের বন্দরে । এত বছর বাদে আজ হালখাতার উপর লিখতে গিয়ে সেই অতীত দিনের কথা মনে হলো । আজ বাবা বেঁচে নেই, সেই চাচাতো ভাইও বেঁচে নেই । পরম করুণাময় আল্লাহপাকের কাছে দোয়া করি, তিনি যেন তাদের জীবনের সব গোনাহ্ মাফ করে জান্নাতবাসী করেন ।

চার
দিন আসে, দিন যায় । দিন বদলের সঙ্গে সঙ্গে ভোল বদলায়, সময় পাল্টায়, এমনকি নজরও পাল্টায় । আজকের ভোগবাদী সমাজে মায়াবী হাতছানিতে গ্রামীন জনসমাজ এবং অবকাঠামো পুরোপুরি বিপর্যস্ত, এমনকি বিধ্বস্ত । কালের বিবর্তনে নববর্ষের আদল বদলে গেছে, বিলুপ্ত হয়েছে অনেক ধরনের উৎসব, আচার-আচরণ । তবে বিনিময়ে এসেছে জনমানুষের জীবনে নানান পরিবর্তন । এনালগ জীবন হয়েছে ডিজিটাল । দূরের মানুষ অনায়াসে চলে এসেছে মুঠোর ভেতর । এত কিছু পরিবর্তনের পরেও বর্তমানে গ্রামের এবং শহরের মানুষেরা জাকজমকপূর্ণভাবে বাংলা নববর্ষ উদযাপন করে । তবে আগের মতো আন্তরিকতা নেই । এখন সবই ব্যবসায়িক এবং আত্মকেন্দ্রিক, তাতে না আছে মমতার কোমল স্পর্শ, না আছে 

পাঁচ
আজ এই পরবাসে মধ্য জীবনে এসে কেন জানি শৈশবের ফেলে আসা কিংবা হারিয়ে যাওয়া অনেক স্মৃতি ফিরে পেতে ইচ্ছে হয় । প্রায় সারাক্ষণই মনটা ভীষণ আকুলি-বিকুলি করে । মাঝে মাঝে প্রচন্ড ইচ্ছে হয় চিৎকার করে বলি, ‘একবার যেতে দে না আমায় ছোট্ট সোনার গাঁয়’, কিংবা আক্ষেপের ভরা সুরে বলি, ‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম’ ।
পরিশেষে বলবো, ‘সেই যে আমার নানান রঙের দিনগুলি’ আজ আর নেই । হারিয়ে গেছে স্মৃতি-বিস্মৃতির অতলান্তে । তবে মাঝে মাঝে কোন অলস মুহূর্তে কিছু কিছু স্মৃতি সমস্ত বাঁধন ছিন্ন করে বুদবুদের মতো ভেসে উঠে মনের সরোবরে । তখন সেসব স্মৃতি নিয়ে নাড়াচড়া করতে বেশ ভালোই লাগে । আর যেগুলো কখনই ভেসে উঠে না, সেগুলো না হয় অধরাই থাক । থাক না স্মৃতি সুধায় ভরা আমার মনের গোপন পাত্রখানি ।
******