উইলিয়াম এ এস আউডারল্যান্ড বীর প্রতীক - ফজলে ইলাহি মাহমুদ শাহীন
(এই লেখকের ‘একাত্তরের বিদেশি বন্ধু^ বই থেকে এই লেখাটি পূণমুদ্রিত হল)
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অনেক বিদেশি নাগরিক অপরিসীম ভূমিকা রাখেন। মুক্তিযুদ্ধের এ রকম বিদেশি বন্ধুদের ঠিক সংখ্যা নির্ধারণ করা কঠিন। তাদের মধ্যে কার অবদান বেশি গুরুত্বপূর্ণ তার তুলনা করাও অবান্তর। তবে এই সব বন্ধুদের মধ্যে উইলিয়াম এ এস আউডারল্যান্ড ছিলেন একজন ব্যাতিক্রম। তিনি শুধু মুক্তিযুদ্ধের একজন বন্ধু ছিলেন না। তিনি স্বয়ং ছিলেন একজন মুক্তিযোদ্ধা। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তিনি সশরীরে অংশগ্রহণ করেন। তাঁর বীরত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ‘বীর প্রতীক’ খেতাব প্রদান করে। আউডারল্যান্ড একমাত্র বিদেশি যিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের জন্য বীরত্ব ব্যঞ্জক খেতাব লাভ করেন।
আউডারল্যান্ড ছিলেন ডাচ বা নেদারল্যান্ড বংশোদ্ভুত অস্ট্রেলিয়ান নাগরিক। তিনি ১৯১৭ সালের ৬ ডিসেম্বর নেদারল্যান্ডের আমস্টারডামে জন্মগ্রহণ করেন। তখন ইউরোপ জুড়ে চলছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। ১৭ বছর বয়সে পড়াশুনা ছেড়ে দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৩৪ সালে তিনি বাটা জুতা কোম্পানিতে যোগ দেন। ১৯৩৬ সালে আউডারল্যান্ড যোগ দেন রয়াল নেদারল্যান্ড সামরিক বাহিনীতে। ১৯৪০ সালে নেদারল্যান্ড সেনাবাহিনীর হয়ে কমান্ডো গেরিলা হিসেবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যোগ দেন। হিটলারের নাৎসী বাহিনী নেদারল্যান্ড দখলের পর তিনি নাৎসী বাহিনীর হাতে বন্দী হন। কিন্তু আউডারল্যান্ড নাৎসী বাহিনীর কারাগার থেকে কৌশলে পালিয়ে আসতে সক্ষম হন। নাৎসী কারাগার থেকে পালিয়ে এসে তিনি নেদারল্যান্ড আন্ডারগ্রাউন্ড মুভমেন্টের গোয়েন্দা হিসেবে কাজ করেন। জার্মান ভাষায় দক্ষতা তাঁকে গোয়েন্দার ভূমিকায় সাহায্য করে। তিনি জার্মান সামরিক সদস্যদের সাথে ঘনিষ্ঠতা গড়ে তোলেন। তাদের কাছ থেকে গোপন সংবাদ উদ্ধার করে মিত্রশক্তির সামরিক বাহিনীর কাছে পৌঁছে দিতেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে আউডারল্যান্ড ফিরে যান বাটা কোম্পানির চাকুরিতে।
ষাটের দশকে আউডারল্যান্ডের কর্মস্থল ছিল সিঙ্গাপুরে। সেখান থেকে বদলী হয়ে ঢাকায় এলেন ১৯৭০ সালে। প্রোডাকশন ম্যানেজার হিসেবে যোগ দিলেন টঙ্গীতে অবস্থিত বাটা ফ্যাক্টরিতে । ১৯৭০ সালের শেষের দিকেই তিনি বাংলাদেশে বাটার ম্যানেজার নিযুক্ত হন। স্ত্রী মারিয়া আউডারল্যান্ডকে নিয়ে থাকতেন ৯৬ গুলশান এভিনিউ এর বাড়িটিতে। ১৯৭১ এর ৭ মার্চের পর থেকে ঢাকার অস্থিতিশীল রাজনৈতিক অবস্থার কারণে তিনি তাঁর স্ত্রীকে অস্ট্রেলিয়ায় পাঠিয়ে দেন। এরপর পুরো যুদ্ধের সময় তিনি একাই বাংলাদেশে অবস্থান করছিলেন। তবে যুদ্ধের শেষের দিকে গুলশানের বাড়িতে নিরাপদ বোধ না করায় ১ ডিসেম্বর তারিখে তিনি রেডক্রস ঘোষিত নিরপেক্ষ এলাকা হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টালে ( বর্তমানে শেরাটন) গিয়ে ওঠেন।
আউডারল্যান্ড ছিলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একজন সৈনিক। তিনি ছিলেন উদার এবং মানবিক গুণে সমৃদ্ধ একজন মানুষ। বাংলাদেশের জন্য প্রথম থেকেই তাঁর হৃদয়ে ছিল সহানুভূতি ও ভালবাসা। এই গরীব দেশের মানুষের দারিদ্র তাঁকে পীড়িত করত। ১৯৭১ এর ২৫ মার্চ এই নীরিহ জনগোষ্ঠীর ওপর পাকবাহিনীর বর্বর হামলা আউডারল্যান্ডের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। বরং পাক বাহিনীর গণহত্যা আউডারল্যান্ডকে যৌবনের প্রথমদিন গুলোতে ইউরোপে দেখা হিটলার এর নাৎসী বাহিনীর হত্যাযজ্ঞর কথা মনে করিয়ে দেয়। মনে পড়ে মাত্র আধা ঘন্টায় নাৎসী বিমান বাহিনীর অপারেশনে নেদারল্যান্ডের রটেরডাম শহরের ৩০,০০০ নাগরিক নিহত হয়েছিল। মাতৃভূমির সেই বিষাদময় স্মৃতি তাঁর সৈনিক এবং মানবিক সত্ত্বাকে নাড়া দেয়। তাঁকে আবার যুদ্ধের দিকে টেনে নিয়ে যায় । তিনি সিদ্ধান্ত নেন এ দেশের মানুষের মুক্তির জন্য লড়াই করবেন। এবারের যুদ্ধ মাতৃভূমির জন্য নয়। অনেক দূরের ছোট্ট ও দরিদ্র একটি দেশের মানুষের মুক্তির জন্য যুদ্ধ। যুদ্ধ মানবতার জন্য।
বিদেশি নাগরিক হিসেবে এবং একটি বহুজাতিক কোম্পানির ম্যানেজার হিসেবে আউডারল্যান্ডের পাকিস্তানি সেনাছাউনীতে সহজ প্রবেশাধিকার ছিল। তিনি এই সুবিধা এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে গোয়েন্দাগিরির অভিজ্ঞতা ব্যবহার করে উচ্চপদস্থ পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তাদের সাথে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। প্রথমে তিনি ২২ বালুচ রেজিমেন্টের অধিনায়ক লে. সুলতান নেওয়াজের সাথে অন্তরঙ্গতা গড়ে তোলেন। সেই সুবাদে তিনি ঢাকা সেনানিবাসে যাতায়াত শুরু করেন এবং আরও বেশি সংখ্যক সামরিক কর্তকর্তার সাথে পরিচিত হন। এক পর্যায়ে পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক গভর্নর লে. জেনারেল টিক্কা খান, পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডার লে. জেনারেল নিয়াজি এবং সিভিল এ্যাফেয়ার্স এ্যাডভাইজার মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলির সাথে তাঁর হৃদ্যতা গড়ে ওঠে। এই সম্পর্ক ব্যবহার করে তিনি পাকিস্তানি বাহিনীর কাছ থেকে সব ধরনের নিরাপত্তা ছাড়পত্র সংগ্রহ করেন। এর ফলে কার্ফিউসহ যে কোন সময় তিনি যে কোন জায়গায় অবাধে যাতায়াতের অধিকার পান
এভাবে আউডারল্যান্ড পাকিস্তানি বাহিনীর অনেক গোপন পরিকল্পনার খবর সংগ্রহ করতেন। সে সব তথ্য মুক্তিবাহিনীর কাছে সংগোপনে পৌঁছে দিতেন। এভাবেই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। তিনি অর্থনৈতিকভাবে এবং বাটা জুতাসহ অন্যান্য সামগ্রী দিয়েও মুক্তিবাহিনীর সদস্যদের সাহায্য করেন। আউডারল্যান্ড পাকিস্তানি সৈন্যদের হত্যাকান্ড ও অত্যাচারের অনেক ছবিও তোলেন। এসব ছবি তিনি আন্তর্জাতিক পত্রপত্রিকায় প্রেরণ করে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশ্বজনমত গঠনে ভূমিকা রাখেন। এক পর্যায়ে তিনি মুক্তিবাহিনীর সাথে আরও সরাসরি জড়ালেন নিজেকে। তিনি মুক্তিবাহিনীর সদস্যদের গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করলেন।
বাটা কোম্পানিতে আউডারল্যান্ডের একজন ঘনিষ্ঠ সহকর্মী ছিলেন জনাব এম এ মালেক । ২৭ মার্চ কারফিউ তুলে নেয়ার পর এম এ মালেক আউডারল্যান্ডের সাথে দেখা করেন। আউডারল্যান্ড তাঁকে সাবধানে থাকতে বলেন এবং শ্রমিকদের বেতন দেয়ার ব্যবস্থা করতে বলেন। যুদ্ধের প্রথমদিকে মাস দুয়েক বাটা ফ্যাক্টরি বন্ধ রাখা হয়। এম এ মালেক তখন গ্রামের বাড়িতে চলে যান। এরপর ফ্যাক্টরি চালু হলে জুন মাসে আবার কাজে যোগ দেন। ফিরে এসে তিনি বুঝতে পারেন আউডারল্যান্ড বাঙালিদের মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতা করছেন। গোপনীয়তার স্বার্থে এম এ মালেকসহ মাত্র দু’একজন ঘনিষ্ঠ সহকর্মীর সাথে তিনি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে আলাপ করতেন। এম এ মালেক আউডারল্যান্ডের সাথে টঙ্গীতে বাটা ফ্যাক্টরির পাশে টেলিফোন শিল্প সংস্থা ভবনে স্থাপিত সেনাবাহিনীর যুদ্ধকালীন দপ্তরে একাধিকবার গিয়েছিলেন। তাঁরা বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘœ, শ্রমিকের অভাব সহ যুদ্ধজনিত কারণে উদ্ভুত ফ্যাক্টরি চালনায় অন্যান্য সমস্যা নিয়ে আলোচনার অজুহাতে সেখানে যান। সেখানে প্রবেশের সময় আউডারল্যান্ড গাড়িতে অস্ট্রেলিয়ান পতাকা ব্যবহার করেছিলেন। কথাপ্রসঙ্গে সেনা অফিসারদের কাছ থেকে তিনি তাঁদের অপারেশন সহ নানা ভবিষ্যত পরিকল্পনা সম্পর্কে তথ্য উদ্ধার করেন। এম এ মালেকসহ কয়েকজন বিশ্বস্ত সহকর্মী তুরাগ নদীর ওপারে উলুখোলা নামক জায়গায় অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে এসব তথ্য পৌঁছে দেন। এছাড়া মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য জুতা এবং অন্যান্য সামগ্রীও গোপনে নৌকা যোগে পাঠানো হয়। ১ ডিসেম্বর আউডারল্যান্ড এম এ মালেককে অনুরোধ করেছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের একটি পতাকা সংগ্রহ করে দিতে। এম এ মালেক চক বাজার থেকে একটি পতাকা সংগ্রহ করেন। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে ধরা পড়ার ঝুঁকি এড়িয়ে তিনি ইন্টারকন্টিন্টোল হোটেলে আউডারল্যান্ডকে পতাকাটি পৌঁছে দিয়েছিলেন।
আউডারল্যান্ড নিজের জীবন বিপন্ন করে কেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে জড়ালেন সে সম্পর্কে তাঁর নিজস্ব ব্যাখ্যা পাওয়া যায় একটি চিঠিতে যেটি তিনি ফরিদি নামক একজন মুক্তিযোদ্ধাকে লিখেছিলেন ১৯৯৭ সালে।
এখানে চিঠিটির বাংলা অনুবাদ অন্তর্ভুক্ত করা হল:
প্রিয় জনাব ফরিদি
বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য ১৯৭১ সালে বাঙালিদের যুেদ্ধর প্রাসঙ্গিক ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এবং ঘটনাসমূহ পরবর্তী প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণের উদ্যোগ সম্পর্কে জানিয়ে আপনার ২৪ জানুয়ারি ১৯৯৭ এর চিঠির জন্য ধন্যবাদ।
যারা এ যুদ্ধের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল তাদের একজন হিসেবে আমি আপনার অনুরোধের প্রেক্ষিতে নিম্নোক্ত তথ্য প্রদান করছি। প্রথমত নিজের প্রসঙ্গে, তারপর ১৯৭১ এর যুদ্ধের কিছু স্মৃতিচারণ করব। আমি জন্মগ্রহণ করি ১৯১৭ সালের ডিসেম্বর মাসে নেদারল্যান্ডের আমস্টারডামে, তখন ইউরোপ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কবলে তৃতীয় বর্ষ পার করছে। আমি বাটা জুতা কোম্পানিতে চাকুরিতে যোগদান করার কিছুদিন পরই আমাকে সরকার থেকে তলব করা হয়। জার্মানী কর্তৃক আমার মাতৃভূমি আক্রান্ত হবার কিছুদিন আগে ডাচ রাজকীয় সেনাবাহিনীতে সার্জেন্ট হিসেবে যোগ দেয়ার জন্য আমাকে নির্দেশ দেয়া হয়। এডলফ হিটলারের জার্মান জান্তার অত্যাধুনিক অস্ত্র শস্ত্র সজ্জিত বাহিনীর ট্যাংকের মুখোমুখি হয় আমার ৩৬ সদস্যের প্লাটুন যার প্রত্যেকের কাছে ছিল খাটো রাইফেল ও ১২ রাউন্ড করে গুলি। আমরা যখন শত্রুর মুখোমুখি হতে যাচ্ছি তখন আমাদের মাথার ওপও দিয়ে জার্মান যুদ্ধবিমানগুলো রটেরডাম আক্রমণ করতে উড়ে যাচ্ছিল। তাদের ব্যপক আক্রমণে মাত্র আধা ঘন্টার মধ্যে ৩০,০০০ নিরপরাধ ডাচ্ নাগরিক নিহত হয়। রটেরডামে জার্মান বোমা হামলার পর জার্মান জান্তারা নেদারল্যান্ড, বেলজিয়াম এবং ফ্রান্সের অন্যান্য শহরের উদ্দেশ্যে একটি আল্টিম্যাটাম পাঠায়। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে নেদারল্যান্ড, বেলজিয়াম এবং ফ্রান্সের জনগণ জার্মানীর নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।
ইন্টার্ন হিসেবে কিছুদিন কাজ করার পর আমি গোপন ডাচ বাহিনীতে যোগ দিলাম। আমি যেহেতু জার্মান ভাষা ভাল জানতাম এবং অনেক ডাচ আঞ্চলিক ডায়ালেক্টগুলো জানতাম সে জন্য আমার পক্ষে উচ্চপদস্থ জার্মান কর্মকর্তার সাথে সম্পর্ক স্থাপন করা সম্ভব হয় এবং ডাচ গোপন বাহিনী ও মিত্র বাহিনীকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়ে সাহায্য করা সম্ভব হয়। ১৯৭১ এর মার্চ মাসে যখন পাকিস্তানি ট্যাঙ্ক ঢাকার রাস্তায় নেমে এল তখন ইউরোপে আমার যৌবনের অভিজ্ঞতা মনে পড়ে যায়। আমি বাঙালিদের অবস্থাটা পুরোপুরি বুঝতে পারছিলাম এবং সেই বোধই আমাকে তাদের পক্ষেক্ষ কিছু করার জন্য টেনে নিল।
পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে পাকিস্তানিদের নির্বিচার ও নৃশংস আক্রমণে হাজার হাজার বাঙালি নিহত হল। আমি যেহেতু স্বাধীনভাবে চলা ফেরা করতে পারছিলাম আমার মনে হল বাইরের বিশ্বকে এখানকার পরিস্থিতি জানানোর জন্য কিছু করা উচিত। আমি নির্দোষ বাঙালি এমনকি শিশুদের ওপর পাকিস্তানিদের অত্যাচারের কিছু ছবি তুলতে পেরেছিলাম। বাঙালিদের দুর্দশার এসব ছবি আমি আন্তর্জাতিক পত্র পত্রিকায় পাঠাতে পেরেছিলাম।
বাঙালিদের ওপর পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর নির্মম, নিষ্ঠুর ও অসহনীয় অত্যাচার নির্যাতনের দৃশ্য দেখে আমি গভীরভাবে মর্মাহত হই। আমি গোপনে নির্ভীক বাঙালিদের সাথে টঙ্গীর বাটা ফ্যাক্টরির ভেতরে এবং বাইরে সেক্টর ১ ও ২ এ গেরিলা কার্যক্রম শুরু করি। একটি বহুজাতিক কোম্পানির প্রধান হিসেবে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর উচ্চ পর্যায়ে আমার যাতায়াত ছিল। এর ফলে বাঙালি মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করা আমার জন্য সহজ হয়েছিল।
আমি প্রশিক্ষণ দিতাম এবং গেরিলা তৎপরতায় সাহায্য করতাম। আমি সব করেছি বাঙালিদের প্রতি যে গভীর ভালবাসা এবং হৃদ্যতা অনুভব করতাম তার কারণে।
আমি আরও অনেক বিস্তারিত বলতে পারতাম কিন্তু এখন তা প্রায় অসম্ভব কারণ এখন আমি অবসরপ্রাপ্ত এবং প্রায় অন্ধ।
আমি একটি এ্যালবাম পাঠাচ্ছি যেখানে বাঙালিদের ওপর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অত্যাচারের এবং না বলা দুর্দশার ছবি আছে। সেই সাথে কিছু মুক্তিযোদ্ধারও ছবি আছে যাদের আমি নিজের ছেলের মত মনে করি।
আশা করি এগুলো আপনার উদ্যোগে কাজে আসবে। আমি আপনার সফলতা কামনা করি।
আপনার বিশ্বস্ত ডব্লিউ এ এস আউডারল্যান্ড
পার্থ, অস্ট্রেলিয়া
২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৭
আউডারল্যান্ড যখন এ চিঠি লেখেন তখন তিনি অসুস্থ এবং প্রায় অন্ধ হয়ে গেছেন। তাই আরও বিস্তারিত লিখতে পারেননি। এর আগে তাঁর ইচ্ছা থাকলেও অভিজ্ঞতাগুলো লেখা হয়ে ওঠেনি। বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জনের পর আউডারল্যান্ড ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত এখানে বসবাস করেন। দুঃখজনক যে এই দীর্ঘ সময় তাঁর কাছে গিয়ে অভিজ্ঞতাগুলো কেউ লিপিবদ্ধ করেছে বলে জানা যায় না। তারপর তিনি শারিরীক অসুস্থতার কারণে অস্ট্রেলিয়ায় চলে যান এবং অস্ট্রেলিয়ার পার্থ নগরীতে স্থায়িভাবে বসবাস করেন।
উপরোক্ত চিঠিটি অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী সাবেক ছাত্র ও যুবনেতা এবং মুক্তিযোদ্ধা জনাব কামরুল আহসান খানের কাছ থেকে প্রাপ্ত। কামরুল আহসান খান ১৯৯৪ সালে অস্ট্রেলিয়ায় অভিবাসি হওয়ার পর থেকে আউডারল্যান্ডের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। তিনি অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী অন্যান্য বাঙালিদের সাথে আউডারল্যান্ডকে নিয়ে আলোচনা করেন। অনেকেই আউডারল্যান্ড সম্পর্কে নতুন করে উৎসাহিত হন।
২০০০ সালের নভেম্বর মাসে সিডনী থেকে অজয় দাশগুপ্ত একটি কলাম লেখেন দৈনিক প্রথম আলোতে। তিনি আউডারল্যান্ডের স্ত্রী মারিয়া আউডারল্যান্ডের উদ্ধৃতি দিয়ে লেখেন, আউডারল্যান্ড তখনও থাকতেন বাংলাদেশের ভাবনায় ব্যকুল। দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হয়ে যাওয়ার পরেও বাংলাদেশ সম্পর্কে কোন লেখা পেলেই চোখের সামনে মেলে ধরতেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক হত্যাকান্ড এমনকি রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় তিনি বিক্ষুব্ধ হতেন। মারিয়া জানান, তাঁর জন্য এটাই ছিল স্বাভাবিক, কারণ তিনি স্বচক্ষে মুক্তিযুদ্ধ দেখেছেন, নিজে যুদ্ধ করেছেন এবং মুক্তিযোদ্ধাদেরকে তিনি নিজের ছেলের মত দেখতেন। অজয় দাশগুপ্ত তাঁর কলামে আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করেছেন,“অকুতোভয় এই বীর মুক্তিযোদ্ধা একাত্তরে আমাদের হয়ে শুধু যুদ্ধ করেননি, এখনও তাঁর পরিচয়ে সে স্মৃতি বহন করে চলেছেন। তাঁর প্যাডে দেখেছি ডাব্লিউ এ এস আউডারল্যান্ড বি. পি. লেখা। এই যে বীর প্রতীক (বি. পি.) খেতাবটি, নিজের নামের সাথে তার সংযুক্ত বজায় রেখে ‘তিনি আমাদের লোক’ এই পরিচয় তুলে ধরেছেন আজীবন।” মারিয়া জানিয়েছিলেন, আউডারল্যান্ড তাঁকে ও তাঁদের কন্যাকে বলতেন,“বাংলাদেশ আমাদের ভালবাসা। পরবর্তী প্রজন্মের প্রতি আবেগের এই ধারাটা অব্যাহত রেখো।” ২০০০ সালে আউডারল্যান্ডের ৮৩ তম জন্মদিবস উপলক্ষে অস্ট্রেলিয়ায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের পক্ষ থেকে তাঁকে পুস্পস্তবক পাঠানো হয়। এর আগে একটি ই-গ্রুপ খুলে আউডারল্যান্ড সম্পর্কে তথ্যাদি সংগ্রহের জন্য একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়েছিল। এই ই-গ্রুপের মাধ্যমে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে অনেকেই আউডারল্যান্ডকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা এবং মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য শ্রদ্ধা জানিয়েছিলেন। সেসব শুভেচ্ছা বার্তা এক সাথ করে তাঁর কাছে পাঠানো হয়েছিল। তাঁর স্ত্রী মারিয়ার কাছ থেকে জানা যায়, শুভেচ্ছাবার্তাগুলো আউডারল্যান্ডকে পড়ে শোনালে তিনি আবেগ আপ্লুুত হয়ে পড়েছিলেন। এটি ছিল আউডারল্যান্ডের শেষ জন্মদিন।
আউডারল্যান্ড সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ ও প্রচারের মাধ্যমে প্রবাসীদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করার উদ্দেশ্যে কামরুল আহসান খান আউডারল্যান্ডের ওপর একটি ওয়েবসাইট খোলার উদ্যোগ নেন। ক্যানবেরায় অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে অধ্যয়নরত গোলাম হোসেন তপন, ফউজুল আজিম, মো. কামাল উদ্দিন এবং ক্যানবেরা প্রবাসী আইটি এক্সপার্ট মুহিত মাসিহ তাঁর সাথে যুক্ত হন। তাঁরা আউডারল্যান্ড সংক্রান্ত তথ্য, ছবি, চিঠি এবং তাঁর ওপর বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত লেখা সংগ্রহ করেন। এসব তথ্য সংগ্রহ এবং ওয়েব সাইটে পরিবেশনের মাধ্যমে তাঁরা আউডারল্যান্ডের ওপর তথ্য অনুসন্ধান ও গবেষণামূলক কাজের একটি মহৎ সূচনা করেন। ২০০১ সালের মার্চ মাসে স্বাধীনতার ৩০ বৎসর উদযাপন উপলক্ষে অস্ট্রেলিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার মির্জা শামসুজ্জামান ক্যানবেরায় বাংলাদেশ হাইকমিশন ভবনে ওয়েব সাইটটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। ওয়েবসাইটির লিংক এখানে দেয়া হল: http://www.banglaweb.com/ouderland/.
জানা যায় আউডারল্যান্ড ১৯৭৫ এর পরে বাংলাদেশের নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করেছিলেন। তৎকালীন বাংলাদেশ সরকার তাঁর আবেদনটিকে গুরুত্ব সহকারে দেখেননি। ফলে এটি ফাইলচাপা পড়ে যায়। পরবর্তীতে অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী বাঙালিরা ই-নেটওয়ার্কের মাধ্যমে আউডারল্যান্ডের নাগরিকত্বের জন্য কয়েক হাজার স্বাক্ষর সংগ্রহ করেন। এ সব স্বাক্ষর সহ তাঁরা আউডারল্যান্ডের নাগরিকত্বের জন্য একটি আবেদন জমা দেন বাংলাদেশ সরকারের কাছে। কিন্তু এর কিছুদিন পরেই আউডারল্যান্ড মৃত্যুবরণ করেন। বস্তুত বাংলাদেশের নাগরিকত্ব আউডারল্যান্ডের প্রয়োজন ছিল না। তিনি ছিলেন প্রাচুর্যময় দেশ অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক। সেখানে তাঁর বাড়িঘর সব ছিল। বাংলাদেশকে তিনি ভালবেসেছিলেন, এদেশটাকে নিজের দেশ বলে ভেবেছিলেন। তাই নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করেছিলেন। বাংলাদেশ তাঁকে নাগরিকত্ব প্রদান করলে তা জাতি হিসেবে আমাদের নিজেদেরকেই সমৃদ্ধ করত এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সমুন্নত করত।
১৯৯৮ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আউডারল্যান্ডকে “বীর প্রতীক” পদক গ্রহণ করার জন্য বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান। কিন্তু অসুস্থতার জন্য তিনি আসতে পারেননি। দীর্ঘদিন হৃদরোগসহ বার্ধক্যজনিত রোগে ভোগার পর ২০০১ সালের ১৮ মে তারিখে তিনি ৮৪ বছর বয়সে অস্ট্রেলিয়ার পার্থে মৃত্যুবরণ করেন। আউডারল্যান্ডের মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর স্ত্রী’র কাছে শোকবার্তা পাঠান। পররাষ্ট্র মন্ত্রী আবদুস সামাদ আজাদও একটি পৃথক শোকবার্তা পাঠিয়েছিলেন। অস্ট্রেলিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রদূত মির্জা শামসুজ্জামান বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তাঁর শেষকৃত্যানুষ্ঠানে যোগ দেন। শেষকৃত্যানুষ্ঠানে আউডারল্যান্ডের কফিন বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা দিয়ে আচ্ছাদিত করে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সম্মান প্রদর্শণ করা হয়। পার্থে বসবাসরত প্রবাসী মুক্তিযোদ্ধারা আউডারল্যান্ডের উদ্দেশ্যে সামরিক কায়দায় গার্ড অব অনার প্রদান করেন।
আউডারল্যান্ডের মৃত্যুর পর কামরুল আহসান খান এর উদ্যোগে ক্যানবেরায় আউডারল্যান্ড মেমোরিয়াল কমিটি গঠন করা হয়। আউডারল্যান্ড মেমোরিয়াল কমিটি ২০০১ সালে তাঁর স্মরণে ক্যানবেরায় একটি স্মরণসভা আয়োজন করে যেখানে বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ হাসান ইমাম, শাহরিয়ার কবির এবং মেজর (অবঃ) রফিকুল ইসলাম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া অস্ট্রেলেয়িয়ায় বাংলাদেশ হাই কমিশনার, অন্যান্য দেশের রাষ্ট্রদূত এবং অস্ট্রেলিয়া সরকারের প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেন। ২০০৮ সালের স্বাধীনতা দিবস উদযাপন উপলক্ষে আউডারল্যান্ড মেমোরিয়াল কমিটি অস্ট্রেলিয়ায় মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক একটি চলচ্চিত্র উৎসব আয়োজন করে। আউডারল্যান্ডের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ক্যানবেরায় বাংলাদেশ হাই কমিশন তাঁর নামে একটি গ্রন্থাগার স্থাপন করেছে।
১৯৭১ সালে আমরা প্রাণপ্রিয় জন্মভূমিকে মুক্ত করতে জীবনবাজী রেখে লড়াই করেছি। আমাদের স্বার্থ ছিল শোষণমুক্ত নতুন একটি স্বাধীন দেশ পাব। কিন্তু আউডারল্যান্ড লড়েছিলেন নিঃস্বার্থভাবে। তারুণ্যের দিনগুলোতে তিনি লড়াই করেছিলেন নাৎসীদের বিরুদ্ধে নিজের মাতৃভূমিকে রক্ষা করতে। আর পরিণত বয়সে লড়েছেন বাংলাদেশকে পাকহানাদার মুক্ত করতে। তিনি লড়েছিলেন অন্যায় অবিচার আর মানবতা লঙ্ঘনকারিদের বিরুদ্ধে। তাঁর জীবন পর্যালোচনা করলে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে এক মহৎ এবং বিশ্ব মানবতাবাদী চরিত্র। পৃথিবীতে খুব কম মানুষই পেরেছেন নিজেরদেরকে দেশ বা কালের সীমার উর্দ্ধে প্রতিষ্ঠিত করতে। আউডারল্যান্ড সেই বিরল মানবতাবাদীদের ্একজন। তাঁর আর একটি বৈশিষ্ট্য তিনি বিশেষ কোন মতাদর্শের অনুসারি না হয়েও ছিলেন একজন বিশ্বনাগরিক। এরকম মানুষ যত বেশি জন্মায় বিশ্বমানবতার জন্য ততই মঙ্গল।
আউডারল্যান্ডের অবদান তুলে ধরা ইতিহাস সংরক্ষণ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশের স্বার্থে যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন তাঁর কাছ থেকে মহত্ত্ব, উদারতা আর মানবতাবাদ শিক্ষার জন্য। এর জন্য কিছু উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে যেমন: ঢাকায় তাঁর একটি ভাস্কর্য স্থাপন এবং জাতীয় যাদুঘরে তাঁর নামে একটা গ্যালারি করা যেখানে আউডারল্যান্ডসহ মুক্তিযুদ্ধে অবদান রেখেছেন এমন সব বিদেশীদের অবদান তুলে ধরা হবে। স্কুল পর্যায়ে তাঁর জীবন ও কর্মের বিবরণ পাঠ্য পুস্তকে যুক্ত করা যেতে পারে। এ সব উদ্যোগ নতুন প্রজন্মকে আগ্রহী করবে আউডারল্যান্ড তথা মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জানতে আজো আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদানের পূর্ণ বিবরণ আমরা পাইনি। গেরিলাদের প্রশিক্ষণ দেয়া, বিশেষ অপারেশনে অংশ নেয়া বা কিভাবে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর অত্যাচারের ছবি তুলেছিলেন সে সম্পর্কে বিস্তারিত ও সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায় না। আউডারল্যান্ডের অবদানের যথাযথ মূল্যায়নের জন্য এসব তথ্য সংগ্েরহর জরুরি। এর জন্য প্রয়োজন গবেষণার।
একটি ইতিবাচক তথ্য এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন। কামরুল আহসান খানের নিরলস প্রচেষ্টায় ঢাকা সিটি কর্পোরেশন ২০১০ সালে ঢাকায় অস্ট্রেলিয়ান হাইকমিশনের সামনের রাস্তাটি আওডারল্যান্ডের নামে নামকরণ করেন। ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের মেয়র সাদেক হোসেন খোকা রাস্তাটির নামকরণের ফলক উন্মোচন করেন। এ অনুষ্ঠানে অস্ট্রেলিয়ান হাইকমিশনার জাস্টিন লি, সেক্টর কমান্ডারগণ এবং বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধারা উপস্থিত ছিলেন।
Previous page: Ouderland a man of indomitable courage - Manzurul Ahsan Khan
Next page: W.A.S. Ouderland - Sultan Mahmud